বাংলার লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে আলোচনা করো
ভূমিকাঃ
উনিশ শতকের বাংলায় বিভিন্ন অঞ্চলের বৈষ্ণব ধর্ম মত ও কিছুটা সহজিয়া ও সুফির মতাদর্শে প্রভাবিত বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোকধর্ম সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের খোঁজ পাওয়া যায়। এগুলির মধ্যে ছিল সাহেবধনী, বৈষ্ণব সম্প্রদায়, পাগলপন্থী, খুশি বিশ্বাসী সম্প্রদায়। এদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদের শাসনের দাপটে নিম্ন বর্ণের মানুষজন ও তাদের মত ও বিশ্বাস হয়েছিল উচ্চবর্ণের কাছে অচ্ছত। উচ্চবর্ণ দ্বারা অবদমিত সামাজিক দিক থেকেহীন বল এই অন্তজ শ্রেণীগুলির মানসিক সংকট আরো গভীর হয়েছিল অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্য।
অনেকের মতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অবমাননার ফলে বহু মানুষ নিরাপত্তার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গুরুর পেশায়। এই লোক ধর্ম সম্প্রদায় গুলির কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল যেমন– এই সম্প্রদায়গুলির প্রবর্তক ও বিশ্বাসীরা ছিল সমাজের নিম্ন বর্গের মানুষজন । এরা সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ স্বীকার করত না। কোনরকম ধর্মীয় পুস্তক ও এদের ছিল না। নিজেদের অনুভূতি ও ভাবাদর্শকে এরা ব্যক্ত করতো গান ও দোহার মাধ্যমে। সম্প্রদায়গুলির ধর্মীয় গরুরা শিশ্যদের কাছে উপাস্য দেবতা স্বরূপ ছিলেন।
![]() |
| বাংলার লোকসংস্কৃতি |
কর্তাভজা সম্প্রদায়
উনিশ শতকের প্রথম ভাগে কর্তাভজা সম্প্রদায় উন্নতি লাভ করেছিল। কর্তাভজা সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন আউল চাঁদ নামক একজন সাধক। এই সম্প্রদায়ের মূল কথা ছিল - আউল চাঁদ শ্রীচৈতন্য রূপ নিয়ে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এই সম্প্রদায় বাস করত কাঁচরাপাড়ার উত্তর-পশ্চিমে পাঁচ মাইল দূরে অবস্থিত ঘোষপড়া গ্রামে। 1769 সালে আউলচাঁদের পর তার 22 জন শিষ্যের মধ্যে অন্যতম রামশরণ পাল তাহার পদ গ্রহণ করেন।
লালনশাহী
সমস্ত শোষণের অমানবিকতায় কাঙ্গাল হরিনাথ গ্রামবার্তা প্রকাশিকায় সরব হয়ে ওঠেন। শিব চন্দ্র বিদ্যানর্ব এবং উভরক এর সঙ্গে কাঙালের ছিল প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সংযোগ। জমিদার ব্রাহ্মণদের মতাদর্শের প্রতি লালনের শ্রদ্ধাযোগ্য মন্তব্য নেই। কিন্তু কাঙ্গাল কে এবং লালন কে তারা নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকার না ঘটেলেও লালনের “গানের খাতা” -র মাধ্যমে তাদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ঘটেছিল। লালনের কথা ও দর্শনকে শ্রদ্ধায় গুরুত্বপূর্ণভাবে তিনি তুলে ধরেছিলেন।
লালন ছিলেন হিন্দু এবং ইসলামী সমাজের প্রান্তবাসী মানুষ। জীবনে এবং মরণে সাম্প্রদায়িক ধর্মাচার এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির সংস্কৃতিতে লালন সর্বাংশে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। জাত পাত বিরোধী বেসরা সুফি ফকির এবং ইহ দেহবাসী, বৈষ্ণব তার সঙ্গে লালনের সম্পর্ক। ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের যুক্তিনিষ্ঠ ঐতিহ্যের তিনি সর্বোত্তম প্রতি নিধি। কবীর, তুলসী দাস যেমন উপস্থিত আছে লালনের গানে, তেমনি ই বৈষ্ণব মহাজনেরা, রামপ্রসাদী শাক্ত কবিরা। গান আর কবিতা তখন একাকার হয়েছিল। গ্রামীন জাতার বিচিত্র বাগ্ রীতির সঙ্গে সংস্কৃত উত্তরাধিকার এ নির্মিত তার কবিতার দেহমান। উত্তর-পূর্ব ভারতের এক মহান লোককবি লালন শাহ।
সাধু সন্ন্যাসীদের সচরাচর পূর্ব জীবনের পরিচয় দেওয়া হয় না। এবং গৃহশ্রমের উল্লেখ ও করা হয় না। লালন ও ছিলেন ভেকধারি সাধু। নিজের জাত কূলা বংশের, দৈনন্দিক জীবনের পরিচয় তিনি দেননি। সাধক সত্তাকে ধুলো প্রাত্যাহিতায় পাওয়া যায় না। এই অর্ধে কবিকে জীবন চরিতে পাওয়া যাবে না বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। লালনের বাণী বা গান ই তার জীবন। ভক্তি আন্দোলনে ইষ্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে সাধনা কেন্দ্রিক এক জীবন এবং বিভিন্ন মানবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কুষ্টিয়া জেলার গেওরিয়া গ্রামে কালী গঙ্গার তীরের আখড়ায় একাধিক শিষ্য, ধর্ম কন্যা এবং ক্ষরনীসহ লালন কে আমরা আবিষ্কার করি। শীতকালে আখড়ায় সামান্য জমি ছিল
উত্তরপূর্ব বঙ্গের তার খ্যাতি বিস্তৃত হয়েছিল সাধক, গায়ক,পদকর্তা এবং মহাত্মা হিসেবেও তার বহু শিষ্য ছিল।
লালন পন্থিরা গরুর উপাসনা করত এবং তারা কোন ধর্মে সামিল ছিল না। ইসলামীদের সঙ্গে তার আহার ব্যবস্থা ছিল। বৈষ্ণব ধর্মে ছিল পরম শ্রদ্ধা এক অদ্বিতীয় স্থায়ী বিশ্বাস ছিল। সর্বত্র গীত হত লালনে বহু সংখ্যক গীত। গানের তার নাম,ধর্ম, মত,ও বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যেত। লালনের সামাজিক জীবনে কোন উপাদান পাওয়া যায় না এবং তিনি নিজে বা তার শীর্ষ বর্গ পূর্বাশ্রমের জীবন কথা বলতাম না।
116/112 বছর বয়সে 1890 এর 17 ই অক্টোবর লালনের মৃত্যু হয় । আজ অব্দি 20 টিরও বেশি লালন গীতির সংকলন প্রকাশিত হয়েছে দুই একটি বাদ দিলে এই গুলি সম্পাদনা করেছেন শিক্ষিত ভদ্র লোকেরা। লালন পন্থীদের অর্থ বা পান্ডুলিপি না থাকায় তারা লালনের গান মুদ্রিত করতে পারেননি। লালনের নিজস্ব হস্তলিখিত গান বা পান্ডুলিপির অভাবে ভোলাইয়ের খাতাকে আমরা প্রামাণ্য লেখ রূপের নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। তবে অন্য পাণ্ডুলিপিতে মৌখিকভাবে ছড়িয়েছিল লালনের বহু গান। আঞ্চলিক উচ্চারণে ও ভাষায় বাউল গানের কলি বিভাগে ছেদ চিহ্নে এ পান্ডুলিপির গানগুলি লালনগীতের আদি রূপের প্রামাণ্য নিদর্শন।
সাহেবধনী সম্প্রদায়
সাহেবধনী সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন - সাহেবধনী। সাহেবধনী সম্প্রদায়ের গুরু ছিলেন দুখিরাম পালের পুত্র চরণ পাল। প্রতি বৃহস্পতিবার এই সম্প্রদায়ের অনেক লোক একত্রিত হয়ে উপাসনা ও পরমার্থ সাধন করে।
পাগলপন্থী সম্প্রদায়
পাগলপন্থী সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন সুসঙ্গ পরগনার অন্তর্গত লেটিয়াকান্দা গ্রামবাসী টিপু পাগল। পাগলপন্থী সম্প্রদায়ের মূল কথা ছিল - সকল মানুষই ঈশ্বর সৃষ্ট কেউ কারোর অধীনে নয় সুতরাং কেউ উচ্চ কেউ নীচ এরূপ প্রভেদ করা অসঙ্গত।
রামবল্লভী সম্প্রদায়
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে হুগলির নিকটবর্তী বাঁশবেড়িয়া গ্রামের সর্বধর্ম সমন্বয় আদর্শ অনুপ্রাণিত হয়ে একটি নতুন ধর্ম সম্প্রদায় গঠিত হয়। বাঁশবেড়িয়া গ্রামের রাধাবল্লব নামে একটি অদ্ভুত প্রাকৃতিক লোক রামবল্লভী সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। এই সম্প্রদায় হিন্দু প্রণালীতে দেবতার কাছে ভোগ নিবেদন প্রথার অনুকরণে কৃষ্ণ, খ্রিষ্ট,ও মোহাম্মদ এই তিনজনের উদ্দেশ্যে ভোগ দেওয়া হতো।
বৈষ্ণব সম্প্রদায়
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কয়েকটি শাখার প্রাধান্য দৃষ্টান্ত স্বরূপ স্পষ্টদায়ক, সখী ভাবক, আউল,বাউল,সহজী,সাঁই, নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্র প্রবর্তিত ন্যাড়া, সনাতন গোস্বামী প্রবর্তিত দরবেশ, প্রভৃতি নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রকৃতি সাধন, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে শিষ্য গ্রহণ ও তাদের পরস্পরের অন্ন গ্রহণ প্রভৃতি এদের বৈশিষ্ট্য। উনিশ শতকের দ্বিতীয় পাদে সখি ভাবক সম্প্রদায় কলকাতায় খুব প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। আউল সম্প্রদায় সম্বন্ধে অক্ষয় কুমার দত্ত লিখেছেন যে এদের আরেকটি নাম সহজ কর্তাভোজা । কোন সম্প্রদায় প্রকৃতি সাধন বিষয় এদের ন্যায় উদারভাব অবলম্বন করতে পারেনি। 1830-35 সালে কলকাতার শ্যামবাজারে রঘুনাথ নামে একটি আউল ও তার কতগুলি শিষ্য ছিল।
পূর্বোত্ত সম্প্রদায়গুলি ছাড়া আরো কয়েকটি বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের উল্লেখ করা যেতে পারে।
খুশি বিশ্বাসী সম্প্রদায়
নদিয়া জেলার অন্তর্গত দেব গ্রামের নিকটবর্তী ভাগা গ্রামবাসীনী খুশি বিশ্বাস নামক একজন মুসলমান এই সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন। এই সম্প্রদায়ীরা খুশি বিশ্বাস কে চৈতন্যের অবতার স্বরূপ মনে করেন, বর্ণভেদ মানে না, সকল জাতি একত্রিত হয়ে পরস্পরের মুখে অন্ন তুলে দেয়।
গৌরবাদী
এরা গৌরাঙ্গকে শ্রীকৃষ্ণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ মনে করে। কারণ রাধাকৃষ্ণ একত্র মিলে গৌরাঙ্গ রূপে ভূতলে অবতীর্ণ হন। দেবালয় একমাত্র গৌরাঙ্গের বিগ্রহ স্থাপন করে ও সর্বদা গৌর নাম উচ্চারণ করে।
বলরাম হাড়ি সম্প্রদায়
নদীয়া জেলার অন্তর্গত মেহেরপুর গ্রামের অধিবাসী বলরাম হাড়ি একটি সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেন। শিষ্যরা বলরামকে শ্রীরামচন্দ্র বলে বিশ্বাস করে। এই সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিভেদ নেই। অনেকেই গৃহস্থ কেউ কেউ উদাসীন। এদের মধ্যে বিগ্রহ সেবা প্রচলিত নেই। 1257 (1851 খ্রিষ্টাব্দ)সালে বলরামের মৃত্যুর পর ব্রহ্মমালনী নামে একজন স্ত্রীলোক গুরুর কার্য করত।
তিলকদাসী
হজরৎ, গোবরা ও পাগল নাথ এই তিনজন মুসলমান কর্তৃক কর্তাভজা সম্প্রদায়ের অনুরূপ তিনটি সম্প্রদায়ী স্থাপিত হয় দাস নামে একজন সদগোপ কর্তাভজা সম্প্রদায় ত্যাগ করে নিজ নাম অনুসারে তিলকদাসী নামে স্বতন্ত্র সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজেকে বিষ্ণু শিবাদির অবতার বলে প্রচার করতেন। শান্তিপুর নিবাসী দর্প-নারায়ণ মুচি একটি সম্প্রদায়ের প্রবর্তক।
মূল্যায়ন
1820 সালে প্রকাশিত জয় নারায়ণ ঘোষালের তালিকায় বাংলাদেশে প্রচলিত লোকসংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত নানা বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। পাঁচালী, বিজয়া, আখরাই,খেউড়, প্রভাতী, যাত্রা, ঝুমুর, কীর্তন, কবিগান, ইত্যাদির কথা এই তালিকায় পাওয়া যায়। মহিলারা গাইতেন টপ্পা কীর্তন। তাছাড়াও বাংলার লোকসংস্কৃতি অংশ ছিল মুখে মুখে উচ্চারিত সাহিত্যকর্ম (Oral literary protection) । 1804 সালে টপ্পা গায়ক নিধু বাবু দুটি শখের আখরাই গোষ্ঠী স্থাপন করেন। ধনী বাঙালি পরিবার গুলি আখরাই গানের চর্চার জন্য দল গড়েন। 1820 দশকের মাঝামাঝি আখরাই গানের জনপ্রিয়তা হারিয়ে যায়। এই সময় চল হল কবিয়ালদের গায়ন ভঙ্গের দ্বারা প্রভাবিত হাফ-আখরাই নামে আরেক ধরনের সঙ্গীতের।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় নাগাদ আখরাই, হাফ-আখরাই বা টপ্পাগান এবং গরিবদের প্রিয় কবিগান পিছু হটতে থাকে। ইতিমধ্যে নবদিত ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের অনেকে পুরনো সমাজের মিশ্রিত সংস্কৃতির বাতাবরণের বদলে নিজস্ব একটি উচ্চ বর্গীয় সংস্কৃতির প্রসারের পাশাপাশি চলতে থাকে লোকসংস্কৃতির ক্রমশ পশ্চাদপসরন। বাঙালি ভদ্রলোক লোকসংস্কৃতির বিকাশ এবং নিম্ন বর্গীয়দের সংস্কৃতির ক্রমোপসরণের প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তি ও শিক্ষার প্রসারের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ফসলরূপে।

Comments
Post a Comment
If you have any Questions, please let us know in the comments below.